এক ফোঁটা তেলও রফতানি করতে না দেয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের পাল্টা হুমকি ট্রাম্পের

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

হামলা অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও রফতানি হতে দেয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, তেল সরবরাহ বন্ধের চেষ্টা করলে ইরানকে আরো কঠোরভাবে মোকাবেলা করা হবে। এছাড়া ইরানে সবচেয়ে তীব্র হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে আইআরজিসির এক মুখপাত্র বলেন, যুদ্ধের সমাপ্তি কীভাবে হবে তা ইরানই নির্ধারণ করবে। তিনি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ববর্তী আলোচনার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে আবারো আলোচনায় বসার সম্ভাবনা কম।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলপ্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আগের চেয়ে ‘২০ গুণ বেশি শক্তিশালী’ হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির জবাবে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি হয় সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ হবে, নয়তো যুদ্ধবাজদের জন্য পরাজয় ও কষ্টের পথ হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া বেশকিছু ধারাবাহিক পোস্টের একটিতে এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তিনি লেখেন, ইরান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মূল্যহীন হুমকিতে একদমই ভীত নয়। তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার চেয়েও বড়রা ইরানি জাতিকে নির্মূল করতে পারেনি।

এরই মধ্যে ইরানে সবচেয়ে তীব্র হামলা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। গতকাল ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে পেন্টাগনে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফসের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। হেগসেথ বলেন, ইরানিরা ‘পারমাণবিক বোমা’র দিকে এগোচ্ছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটা কখনই হতে দেবেন না। তিনি আরো বলেন, ইরানের ধর্মীয় নেতারা জানেন, তাদের সামরিক বাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। এখন তাদের একাকী ও শোচনীয়ভাবে পরাজয় হচ্ছে। এ সংঘাত কতদিন চলবে সে বিষয়ে তিনি জানান, শত্রুপক্ষ পুরোপুরি পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা শান্ত হব না।

এদিকে গতকাল ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক পরস্পরবিরোধী বার্তার কারণে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে অস্থিরতা এবং তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন ট্রাম্প। স্থানীয় সময় সোমবার তিনি এক ফোন সাক্ষাৎকারে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। কিন্তু তার বক্তব্যে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা না থাকায় বিভ্রান্তি আরো বেড়ে যায়। তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সবকিছুর জন্যই আমার পরিকল্পনা আছে। আপনারা খুবই খুশি হবেন।’ অন্যদিকে সিবিএস নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ‘যুদ্ধ কার্যত প্রায় শেষের পথে। যুদ্ধ প্রায় শেষ। আমরা সময়সূচির অনেক আগেই এগিয়ে আছি।’

ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের পর ধারণা করা হয়েছিল সামরিক অভিযান হয়তো শেষের দিকে এগোচ্ছে। ফলে শেয়ারবাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় এবং দিনের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে যাওয়া তেলের দাম কমে ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে আবারো অবস্থান বদলান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তেই আমরা এটাকে অসাধারণ সাফল্য বলতে পারি। আবার চাইলে আরো এগোতেও পারি। আর আমরা আরো এগোব।’ এর পরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানে সবচেয়ে তীব্র হামলার ঘোষণা দেন।

পরস্পরবিরোধী এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়, তার বক্তব্য এবং হেগসেথের মন্তব্যের মধ্যে বিরোধ রয়েছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, ‘দুটোই সত্য হতে পারে।’ মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা একাধিকবার পাল্টে যাওয়ায় যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য বা সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো গভীর হয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল জাজিরাকে বলেন, সামরিক অগ্রগতিকে কীভাবে এমন একটি রাজনৈতিক পরিণতিতে রূপ দেয়া হবে, উপসাগরীয় মিত্র দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তুলনামূলকভাবে ভালো হবে, তার উত্তর এখনো মেলেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাটতি এখানেই। ক্রিগের ভাষায়, ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে হিসাবটি তুলনামূলকভাবে সহজ। যতক্ষণ তারা পুরোপুরি হারছে না, ততক্ষণ তারা জিতছে। তাদের এ জয়ই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের পরাজয়ে রূপ নেবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টা তাকে ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি স্পষ্ট কৌশল নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য অনেকটাই অর্জিত হয়েছে এবং এখন একটি ‘এক্সিট প্ল্যান’ সামনে আনতে পারলে প্রশাসন এ অভিযানকে সফল মিশন হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তা রাজনৈতিকভাবে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চায় না। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে গেলে অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—যা নিয়ে উদ্বিগ্ন ট্রাম্প নিজেও।

ইরান যুদ্ধ বড় অংশেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হচ্ছে এবং তেলের দাম বাড়তে থাকায় এখন তিনি দ্রুত এ সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার। ব্রেমারের মতে, ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাড়তে থাকা ঝুঁকি এখন ওয়াশিংটনকে দ্রুত প্রস্থান কৌশল খুঁজতে বাধ্য করছে। এটা স্পষ্ট যে ইরানের এখনো ড্রোন হামলা চালানো এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সামরিক অভিযানের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’

এর মধ্যে গতকাল মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় কেঁপে উঠছে ইরানের বিভিন্ন শহর। হাশরার ঘটনা ঘটেছে তেহরান, ইসফাহান, তাবরিজ ও আহভাজসহ বিভিন্ন স্থানে। পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরানও। গতকাল হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে ইরান। হামলার নিশানা ছিল ইসরায়েল এবং মধ্যপ্র্যাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা।

ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি এ কথা জানিয়েছে। এতে বলা হয়, আইআরজিসি মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ৩৪তম দফা হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক (শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

এ হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবির কাছে আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে এবং বাহরাইনের জুফায়ার বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত আমেরিকান সেনাদের নিশানা করা হয়। পাশাপাশি ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটি এবং হাইফার বেসামরিক বিমানবন্দর নিশানা করা হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবের পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলের গোপন ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলোতে আঘাত হেনেছে।

এছাড়া বাহরাইনের একটি হোটেলে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ওই হোটেলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। তেহরান টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া লেবানন থেকে ছোড়া রকেটে বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি আহত হয়েছে বলেও জানিয়েছে তেল আবিব। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া বিবৃতিতে বলেছে, লেবানন থেকে নিক্ষেপ করা বেশির ভাগ রকেট আটকানো হয়েছে, কিন্তু দুটি প্রজেক্টাইল (নিক্ষিপ্ত উড়ন্ত বস্তু) আঘাত হেনেছে। এগুলো আঘাত হানার সময় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সতর্কতা জারি করাও সম্ভব হয়নি।

আরও